• দেশে বেপরোয়া গতিতে বেড়ে চলছে ওষুধের দাম

    প্রকাশ: নভেম্বর ১২, ২০১৬ ১:০৪ PM
    A- A+
    দিনকাল রিপোর্ট : সাম্প্রতিক সময়ে বেপরোয়া গতিতে বাড়ছে ওষুধের দাম। এর মধ্যে দেশে উৎপাদিত ওষুধের দাম যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে আমদানি করা ওষুধের দাম। অতি প্রয়োজনীয় ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম বেড়েছে সব চেয়ে বেশি। ওষুধভেদে সর্বনি¤œ ৫ শতাংশ থেকে ২৮৭ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে। এই দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো বা আমদানিকারকরা যেমন কোনো নিয়মনীতি মানছে না, তেমনি সরকারি সংস্থা ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর থেকেও জোরালো তদারকি করা হচ্ছে না।

     ফলে ভোক্তাদের চড়া দামেই ওষুধ কিনতে হচ্ছে। : অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত জুন থেকেই ওষুধের দাম বাড়ানো শুরু হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সব কোম্পানি একসঙ্গে সব ওষুধের দাম বাড়াচ্ছে না। একটি কোম্পানি একটি ওষুধ, অপর কোম্পানি আরেকটি ওষুধ এভাবে দাম বাড়াচ্ছে। ফলে গত ৬ মাসে প্রায় সব ধরনের ওষুধের দামই বেড়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, ১৯৮২ সালে প্রথম জাতীয় ওষুধনীতি ও ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি করা হয়। তখন অত্যাবশ্যকীয় তালিকায় ১৫০টি ওষুধ ছিল।

     এর পর সরকার ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধনীতি সংশোধন করে জাতীয় ওষুধনীতি-২০০৫ প্রণয়ন করে। ওই নীতিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের কোনো তালিকা রাখা হয়নি। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ হিসেবে ২৫৬ ওষুধকে নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু নানামুখী চাপ এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় ওই তালিকা কাটছাঁট করে ২০৯টি আইটেমকে তালিকায় স্থান দেওয়া হয়। এসব ওষুধের দাম সরকার নিয়ন্ত্রণ করে। ওষুধের দাম নির্ধারণের লক্ষ্যে স্বাস্থ্য সচিবের নেতৃত্বাধীন ১৬ সদস্যবিশিষ্ট একটি মূল্য নির্ধারণ কমিটি রয়েছে।

     কমিটিতে ওষুধ শিল্প সমিতি ও কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা আছেন। তালিকাবহির্ভূত ওষুধের দাম নির্ধারণের লক্ষ্যে কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে প্রস্তাব পাঠাবে কমিটির কাছে। ওই কমিটি দাম অনুমোদন করবে। কমিটি ইচ্ছা করলে প্রস্তাবিত দাম কাটছাঁট করতে পারে। সূত্র জানায়, সম্প্রতি যেসব ওষুধের দাম বাড়ানো হয়েছে সেগুলোর ব্যাপারে কমিটির কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি। অনুমোদন ছাড়াই কোম্পানিগুলো ওষুধের দাম বাড়িয়ে যাচ্ছে। : ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প মালিক সমিতির মহাসচিব এসএম সফিউদ্দিন বলেন, যে কেউ ইচ্ছা করলেই ওষুধের দাম বাড়াতে পারে না।

     দাম বাড়াতে হলে ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদন নিতে হবে। প্রায় ২০৯টি ওষুধের দাম চাইলে বাড়ানো যায় না। তিনি বলেন, কাঁচামালের দাম বাড়লে কিছু ওষুধের দাম বাড়ানোর জন্য ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর আবেদন করতে হয়। ওষুধ প্রশাসন যদি দাম বাড়ানোর অনুমতি দেয় তাহলে বাড়ানো সম্ভব। তিনি বলেন, কিছু ওষুধের চাহিদা বেশি। কিন্তু কোম্পানি উৎপাদন কম। এ জাতীয় ওষুধের সংকট দেখিয়ে খুচরা ব্যবসায়ীরা নিজেরাই দাম বাড়িয়ে দেয়। ওষুধের কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে দু-একজন ওষুধের দাম বাড়ানোর জন্য ওষুধ প্রশাসনে আবেদন করেন। কিন্তু এখনো অনুমোদন দেয়নি। কাঁচামালের দাম বাড়লে ওষুধের দাম কিছু বাড়তে পারে। এ ছাড়া কোম্পানির কর্মীদের বেতনভাতা বাড়ানোর ফলে খরচ বেড়েছে। এ কারণেও ওষুধের দাম বাড়াতে হয়েছে। : তিনি বলেন, এর আগে যারা ওষুধের দাম বাড়িয়েছে, আমরা তাদের দাম কমানোর জন্য বলেছি। তারা ওষুধের দাম কমাতে রাজি হয়েছে। কোন কোম্পানি কোন ওষুধের দাম কমাতে পারবে তার তালিকা তৈরি হচ্ছে।

    আমরা এ মাসের মধ্যে সংবাদ সম্মেলন করে অনেক ওষুধের দাম কমানোর ঘোষণা দেব। : খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওরিয়ন ফার্মার ৩০টি পেপ-২ ট্যাবলেট ৬০ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৮, ঠা াজনিত রোগে ব্যবহৃত ১০০টি ডেসলর ট্যাবলেট ৩০০ থেকে বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকায়। বীকন ফার্মার ব্যথার ওষুধ ৫ মিলিগ্রামের ৫০টি ফেঙ্গিব্যাক ট্যাবলেট ২২৫ থেকে বেড়ে ২৫০ টাকা হয়েছে। ১০ মিলির ৫০টি ফেঙ্গিব্যাক ট্যাবলেট আগে ছিল ৪০০ টাকা। বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ টাকা করে। স্কয়ারের অস্টোক্যাল-ডি জাতীয় ট্যাবলেট এক কৌটা ১৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২১০ টাকা। ইনসেপ্টা লসোকোন জাতীয় ট্যাবলেট ১০টির এক পাতা ৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

     : স্কয়ারের সেকরিন-১ জাতীয় প্রতি ট্যাবলেট সাড়ে ৪ টাকা থেকে বেড়ে ৬ টাকা, তাদের এপিট্রা-১ জাতীয় প্রতি ট্যাবলেট ৬ টাকা থেকে বেড়ে ৮ টাকা, ফিলওয়েল সিলভার ও গোল্ড জাতীয় ভিটামিন ৩০ ট্যাবলেটের এক কৌটা ১৯৫ টাকা থেকে বেড়ে ২৮৫ টাকা, নিউরো-বি জাতীয় ট্যাবলেটের এক কৌটা ১৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২৪০ টাকা, ইনসুলিন লেনটাস প্রতিটি ১ হাজার ১১৭ টাকা থেকে ১ হাজার ১৮৯ টাকা, এক্সিয়াম জাতীয় ট্যাবলেট প্রতিটি সাড়ে ৯ টাকা থেকে বেড়ে ১২ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। : বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নোভারটিস কোম্পানির প্রায় প্রতিটি ওষুধের দামই বাড়ানো হয়েছে। আগে ডায়াবেটিসে ব্যবহৃত নোভারটিসের ৩০টি গ্যালভাসমেট ট্যাবলেটের দাম ছিল ৮৪৫ টাকা। বর্তমানে তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৯৪৫ টাকা। একইভাবে ৪৮০ টাকার ভোল্টালিন ট্যাবলেট হয়েছে ৫৮০ এবং ৪৮০ টাকার ভোল্টালিন সাপোজিটরি হয়েছে ৫৮০ টাকা।

    : সানোফি অ্যাভেনটিসের ১২০ মিলির ৩০টি টেলফাস্ট ট্যাবলেট ২০০ থেকে ২৪০ টাকা এবং ১৮০ মিলির ২০টি টেলফাস্ট ২০০ থেকে ২৪০ টাকা করা হয়েছে। মৃগী রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অপসোনিনের ১ মিলির ৩০টি প্যাস ট্যাবলেট ১৫০ থেকে বেড়ে ১৮০ টাকা হয়েছে। এ ছাড়া ৫ মিলির ৫০টি প্যাস ট্যাবলেট ২০০ থেকে বেড়ে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লরিস ৪০ থেকে ৫০ টাকা, লরিস লোসন ৮০ থেকে বেড়ে ১০০ টাকা হয়েছে। একইভাবে হাইসোমাইড-২০ মিলি প্রতিটি ওষুধের দাম ৩ টাকা ৫২ পয়সা থেকে বেড়ে ১৩ টাকা ৬৪ পয়সা করা হয়েছে। : রেনাটা কোম্পানির ফেনাডিন জাতীয় সব ধরনের ওষুধের দাম বাড়ানো হয়েছে। ১২০ মিলির ১০টি ট্যাবলেট ৭০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০ টাকা হয়েছে। ৬০ মিলির প্রতি ১০টি ট্যাবলেট ৩৫ টাকা বেড়ে ৪৫ টাকা হয়েছে।

     : পাইকারি ওষুধ ব্যবসায়ীরা জানান, গত এক থেকে দুই সপ্তাহের আগে কোনাজিপাম গ্রুপের ৬০টি ২ মিলিগ্রাম ট্যাবলেটের মূল্য ছিল ৩৬০ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। : একই গ্রুপের দশমিক ৫ মিলিগ্রামের ৬০টি ওষুধের দাম ৪০০ থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা, ১ মিলিগ্রামের ৬০টি ওষুধের দাম ৩০০ থেকে বাড়িয়ে ৪০০ টাকা করা হয়েছে। : একইভাবে ভিটামিন বি১+, ভিটামিন বি৬+, ভিটামিন বি১২ ওষুধের ৩০টির দাম আগে ১৫০ টাকা ছিল। এখন তা বাড়িয়ে ২৪০ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি প্লাস ১৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১০ টাকা, পটাশিয়াম বাইকার্বনেট ১২৫ টাকার সিরাপ এখন বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা এবং ম্যাগালড্রেইট+সিমেথিকোন ১০০ টাকার সিরাপ ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

    : স্কয়ারের ক্যালবো-ডি ১৫ ট্যাবলেটের প্রতিপাতা ৭৫ থেকে বাড়িয়ে ১০৫ এবং ৩০ ট্যাবলেটের পাতা ১৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১০ টাকা করা হয়েছে। : ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের এক পরিচালক জানান, সরকার একটি সময়োপযোগী স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করছে। এটি করা হলে ওষুধের দাম নির্ধারণের যে জটিলতা বর্তমানে রয়েছে সেগুলো আর থাকবে না।

    সূত্র:dailydinkal