• নামী কলেজের জিপিএ–৫ বিপর্যয়

    প্রকাশ: অক্টোবর ২৭, ২০১৬ ৮:০৬ AM
    A- A+
    ঢাকার ‘নামকরা’ ১০টি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকের ফলে জিপিএ-৫ বিপর্যয় হয়েছে। এ সব কলেজে ২০১৩ সালে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে যারা ভর্তি হয়েছিল ২০১৫ সালে তাদের ৪৫ শতাংশ আগের ফলাফল ধরে রাখতে পারেনি।
    প্রথম আলোর পক্ষ থেকে একাধিক কলেজের ছাত্র ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একেক কলেজে একেক কারণে এমন ফল হচ্ছে। তবে বড় কারণ হলো কলেজে ঠিকমতো ক্লাস না হওয়া এবং সঠিক পরিচর্যার অভাব।
    ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক তাসলিমা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর কাছে মনে হয়েছে, সঠিক পরিচর্যা ও যত্ন নেওয়ার অভাবই এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েও এইচএসসিতে না পাওয়ার বড় কারণ। কারণ, কিছু কলেজে তো যতসংখ্যক জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল, এইচএসসিতে তার চেয়ে বেশি জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
    রাজধানীর ‘নামকরা’ ১০টি কলেজের ২০১৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) দেখেছে, ২০১৩ সালে এসএসসিতে জিপিএ-৫ (গ্রেড পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ ফল) পেয়ে এসব কলেজে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় ৪৫ শতাংশই এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাননি। ওই বছর এসব কলেজে ভর্তি হয়েছিল ১২ হাজার ৮১৫ জন, তাদের মধ্যে জিপিএ-৫ ছিল ৮ হাজার ১৩০ জনের। ২০১৫ সালে এইচএসসিতে এসব কলেজের মোট ৪ হাজার ৪৭৬ জন জিপিএ-৫ পান। অবশ্য অপর ১০টি
    কলেজের ফলে দেখা গেছে, এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া যত শিক্ষার্থী ভর্তি হয়, তার চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
    গত মঙ্গলবার সরকারি বিজ্ঞান কলেজে গিয়ে কথা হয় কয়েকজন ছাত্র ও শিক্ষকের সঙ্গে। মাউশির বিশ্লেষণের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় ওই দিনই প্রকাশিত এই কলেজের একাদশ শ্রেণির প্রথম সাময়িক পরীক্ষার ফলাফলে। এই পরীক্ষায় প্রায় ১ হাজার ২০০ ছাত্র পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছে ৫৩৮ জন। অবশ্য একজন শিক্ষক বললেন, এসব শিক্ষার্থীর বেশির ভাগই মফস্বলের। প্রথমে থাকাসহ সুস্থির হতে হতে সময় চলে যায়।
    সিরাজগঞ্জে বাড়ি এই কলেজের একাদশ শ্রেণির দুজন ছাত্র বলে, এই কলেজের বড় সমস্যা হলো বিভিন্ন কারণে বছরের বড় সময়ই বন্ধ থাকে। ফলে শিক্ষকেরা চাইলেও ঠিকমতো ক্লাস নিতে পারেন না। যেমন, জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা থাকার কারণে ১ নভেম্বর থেকে ১৭ দিন বন্ধ থাকবে। বছরে কয়েক মাস ক্লাস হয়। এ জন্য তাঁরা প্রাইভেট ও কোচিংয়ে পড়ে ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা করেন।
    কলেজে অধ্যক্ষের চলতি দায়িত্বে থাকা পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক মো. আবু বকর মিয়া বললেন, এটা ঠিক যে ২০১৫ সালে ফল কিছু খারাপ হয়েছিল। তবে সবার চেষ্টায় চলতি বছরের ফল ভালো হয়।
    রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম সালেহীন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের কলেজে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া নিজস্ব শিক্ষার্থীর পাশাপাশি বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থীও একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়। তাঁরা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, নিজস্ব শিক্ষার্থীরা উচ্চমাধ্যমিকেও ভালো ফল করছেন। কিন্তু বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থীদের অনেকে ফল ধরে রাখতে পারছেন না। তিনি বলেন, বিভিন্ন ধরনের ছুটি ও বন্ধ থাকায় উচ্চমাধ্যমিকের দুই বছরের শিক্ষাকালের প্রায় অর্ধেক সময় পাওয়া যায়, যা বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থীদের সঠিক পরিচর্যার জন্য পর্যাপ্ত সময় নয়।
    কম জিপিএ-৫ ভর্তি করেও বেশি জিপিএ-৫: মাউশির তদারক ও মূল্যায়ন শাখার বিশ্লেষণে দেখা যায়, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন ১ হাজার ৩৮৭ জন। এর মধ্যে জিপিএ-৫ ছিল ৫৭৩ জনের। কিন্তু এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পান ১ হাজার ৫৭ জন। এসএসসিতে কম জিপিএ-৫ নিয়ে ভর্তি হয়ে বেশি জিপিএ-৫ পাওয়া কলেজের তালিকায় আছে সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বিএন কলেজ, মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, কুর্মিটোলার বিএএফ শাহীন কলেজ, বনফুল আদিবাসী গ্রীন হার্ট কলেজ, কলেজ অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ, আমিরজান কলেজ ও ক্যামব্রিয়ান কলেজ। অবশ্য এগুলোর মধ্যে দু-একটি কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
    এ বিষয়ে সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মাহবুবুর রহমান মোল্লা বলেন, তাঁদের কলেজে কয়েকভাবে শিক্ষার্থীদের নিবিড়ভাবে পরিচর্যা করা হয়। নিয়মিত ক্লাস, সাপ্তাহিক ও মাসিক পরীক্ষার পাশাপাশি ‘নিউক্লিয়ার এডুকেশন টিম’ নামে পৃথক কমিটির মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষার্থীর খোঁজ নিয়ে, বাড়িতে গিয়ে প্রয়োজনমতো পরিচর্যা করা হয়। এ কারণে ফল ভালো হচ্ছে।
    জানতে চাইলে মাউশির মহাপরিচালক এস এম ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, আগে এভাবে তদারক করা হতো না। কলেজগুলোও সারা বছর শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে পরিচর্যা করে না। এখন এই কাজটি যাতে হয়, সে জন্যই তাঁরা ফল বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।

    সূত্র:prothom-alo